ব্রি ধান ৯৬
ব্রি ধান ৯৬ (BRRI dhan96) হলো বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) উদ্ভাবিত বোরো মৌসুমের একটি চমৎকার স্বল্পমেয়াদী এবং উচ্চফলনশীল জাত। ২০২০ সালে এটি চাষাবাদের জন্য অবমুক্ত করা হয়। বিশেষ করে যারা দ্রুত ধান কেটে পরবর্তী ফসল (যেমন: আউশ বা অন্য রবি শস্য) চাষ করতে চান এবং একইসাথে বাম্পার ফলন আশা করেন, তাদের জন্য এটি একটি যুগান্তকারী জাত। নিচে ব্রি ধান ৯৬ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. উদ্ভাবন ও পরিচিতি
বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থায় স্বল্পমেয়াদী ধানের জাত হিসেবে ব্রি ধান ২৮ দীর্ঘদিন রাজত্ব করেছে। কিন্তু বর্তমানে ব্রি ধান ২৮-এ ব্লাস্ট রোগের আক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় তার বিকল্প হিসেবে বিজ্ঞানীরা ব্রি ধান ৯৬ উদ্ভাবন করেছেন। এটি স্বল্প সময়ে ব্রি ধান ২৮-এর চেয়েও বেশি ফলন দিতে সক্ষম।
২. প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ
এই জাতটি তার দ্রুত বৃদ্ধি এবং চমৎকার ফলন ক্ষমতার জন্য পরিচিত:
* গাছের উচ্চতা: গাছ সাধারণত ৮৫-৯০ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। গাছ খাটো এবং কাণ্ড শক্ত হওয়ার কারণে এটি ঝড়ে হেলে পড়ে না।
* জীবনকাল: বীজ বপন থেকে কাটা পর্যন্ত মাত্র ১৪০-১৪৫ দিন সময় লাগে। এটি একটি স্বল্পমেয়াদী জাত।
* চালের ধরন: চাল মাঝারি চিকন এবং সাদা। ভাত বেশ ঝরঝরে ও সুস্বাদু।
* ফলন: হেক্টর প্রতি গড়ে ৭.০ টন পর্যন্ত ফলন দেয়। তবে সঠিক ব্যবস্থাপনায় এটি হেক্টর প্রতি ৮.০ টন পর্যন্ত ফলন দিতে সক্ষম, যা ব্রি ধান ২৮-এর চেয়ে অনেক বেশি।
* এমাইলোজ: এই চালে এমাইলোজের পরিমাণ ২৪.৫%, যা ভাতের গুণমান উন্নত রাখে।
৩. চাষাবাদ পদ্ধতি
সফল ফলনের জন্য নিচের নিয়মগুলো অনুসরণ করা প্রয়োজন:
* বীজ বপন: সাধারণত ১৫ নভেম্বর থেকে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বীজতলায় বীজ বপন করতে হয়।
* চারা রোপণ: ৩০-৩৫ দিন বয়সের চারা রোপণ করা সবচেয়ে ভালো। যেহেতু এটি স্বল্পমেয়াদী জাত, তাই বেশি বয়স্ক চারা রোপণ না করাই উত্তম।
* সার ব্যবস্থাপনা: উফশী জাতের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি, জিপসাম ও দস্তা সার প্রয়োগ করতে হবে। স্বল্পমেয়াদী হওয়ায় সার প্রয়োগের কিস্তিগুলো সঠিক সময়ে সম্পন্ন করতে হয়।
৪. ব্রি ধান ৯৬-এর বিশেষ সুবিধাসমূহ
১. ব্রি ধান ২৮-এর সুযোগ্য উত্তরসূরি
ব্রি ধান ২৮ বর্তমানে রোগবালাইয়ের কারণে তার গৌরব হারাচ্ছে। ব্রি ধান ৯৬ ঠিক একই সময়ে (১৪০-১৪৫ দিন) পাকলেও এর ফলন ২৮-এর চেয়ে ১.০-১.৫ টন বেশি।
২. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা
এই জাতটি নেক ব্লাস্ট (Neck Blast) এবং অন্যান্য প্রচলিত রোগবালাইয়ের প্রতি ব্রি ধান ২৮-এর তুলনায় অনেক বেশি সহনশীল।
৩. ফসল বিন্যাসে সহায়ক
দ্রুত ধান পেকে যাওয়ায় কৃষক এই জমি থেকে ধান কাটার পর অনায়াসেই পরবর্তী ফসল বা আউশ ধানের আবাদ করতে পারেন। ফলে বছরে তিন ফসল চাষ করা সহজ হয়।
৫. কৃষকদের জন্য পরামর্শ
ব্রি ধান ৯৬ চাষের ক্ষেত্রে চারা রোপণের সময় লাইনে রোপণ করা উচিত। এতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল করতে পারে এবং পোকা-মাকড়ের আক্রমণ কম হয়। এছাড়া শীষ বের হওয়ার সময় জমিতে পর্যাপ্ত পানি রাখা জরুরি।
উপসংহার
সংক্ষেপে বলতে গেলে, ব্রি ধান ৯৬ হলো আধুনিক কৃষির একটি "স্মার্ট" জাত। যারা কম সময়ে এবং কম খরচে অধিক ফলন পেতে চান এবং ব্রি ধান ২৮-এর বিকল্প খুঁজছেন, তাদের জন্য ব্রি ধান ৯৬ বর্তমান সময়ের
অন্যতম শ্রেষ্ঠ বোরো জাত।
What's Your Reaction?