ব্রি ধান ১০০

ব্রি ধান ১০০ (BRRI dhan100) বাংলাদেশের কৃষি গবেষণায় একটি বিশেষ মাইলফলক। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে এই জাতটি উদ্ভাবিত হওয়ায় এর নামকরণ করা হয়েছে 'মুজিব ধান'। এটি মূলত একটি জিংক সমৃদ্ধ (Biofortified) উচ্চফলনশীল বোরো ধানের জাত। নিচে ব্রি ধান ১০০ বা মুজিব ধান সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

Jan 28, 2026 - 18:28
 0  5
ব্রি ধান ১০০
ব্রি ধান ১০০

১. উদ্ভাবন ও পরিচিতি

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) ২০২০ সালে এই জাতটি উদ্ভাবন করে এবং ২০২১ সালে এটি চাষাবাদের জন্য অবমুক্ত করা হয়। এটি দেশের মানুষের জিংকের অভাব দূর করার লক্ষ্যে উদ্ভাবিত একটি বিশেষ স্বাস্থ্যসম্মত ধান।

২. প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ

এই জাতটি পুষ্টিগুণ এবং ফলন—উভয় দিক থেকেই অনন্য:

 * পুষ্টিগুণ (জিংকের উপস্থিতি): এই ধানের প্রতি কেজি চালে ২৫.৭ মিলিগ্রাম জিংক রয়েছে। জিংক শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং শিশুদের সঠিক বৃদ্ধিতে অত্যন্ত কার্যকর।

 * গাছের উচ্চতা: ধান গাছ সাধারণত ১০১ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। এর কাণ্ড শক্ত হওয়ায় গাছ সহজে হেলে পড়ে না।

 * জীবনকাল: বীজ বপন থেকে কাটা পর্যন্ত ১৪৫-১৪৮ দিন সময় লাগে (ব্রি ধান ২৮-এর সমসাময়িক)।

 * চালের ধরন: চাল মাঝারি চিকন এবং সাদা। ভাত ঝরঝরে ও সুস্বাদু।

 * ফলন: হেক্টর প্রতি গড়ে ৭.৭ টন পর্যন্ত ফলন দেয়। তবে সঠিক পরিচর্যায় এটি হেক্টর প্রতি ৮.৮ টন পর্যন্ত ফলন দিতে সক্ষম।

৩. চাষাবাদ পদ্ধতি

ব্রি ধান ১০০ চাষের নিয়ম অন্যান্য উফশী বোরো ধানের মতোই:

 * বীজ বপন: ১৫ নভেম্বর থেকে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বীজতলায় বীজ বপন করা উত্তম।

 * চারা রোপণ: ৩৫-৪০ দিন বয়সের চারা রোপণ করতে হবে।

 * সার ব্যবস্থাপনা: বিঘা প্রতি (৩৩ শতাংশ) ইউরিয়া ২৭ কেজি, টিএসপি ১০ কেজি, এমওপি ১৫ কেজি এবং জিপসাম ৮ কেজি প্রয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয়। যেহেতু এটি জিংক সমৃদ্ধ ধান, তাই জমিতে আলাদাভাবে দস্তা (Zinc) সার ব্যবহারের প্রয়োজন খুব একটা পড়ে না।

৪. ব্রি ধান ১০০ বা 'মুজিব ধান'-এর বিশেষ সুবিধাসমূহ

১. পুষ্টি নিরাপত্তা

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের খাদ্যতালিকায় জিংকের অভাব পূরণ করতে এই চাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি একটি প্রাকৃতিক উপায়ে জিংক গ্রহণের উৎস।

২. উচ্চ ফলন ও বাজারমূল্য

এর জীবনকাল ব্রি ধান ২৮-এর মতো কম হলেও ফলন ব্রি ধান ২৯-এর কাছাকাছি। এছাড়া চাল চিকন হওয়ায় বাজারে এর চাহিদাও অনেক বেশি এবং কৃষক ভালো দাম পান।

৩. রোগবালাই প্রতিরোধ

এই জাতটি টুংরো রোগ, ব্লাস্ট রোগ এবং ব্যাকটেরিয়াল লিফ ব্লাইট (BLB) এর প্রতি যথেষ্ট সহনশীল। ফলে কৃষককে বালাইনাশকের পেছনে অতিরিক্ত খরচ করতে হয় না।

৫. কৃষকদের জন্য বিশেষ পরামর্শ

ব্রি ধান ১০০ একটি আধুনিক জাত হওয়ায় এটি নিচু ও মাঝারি উঁচু জমি—উভয় ক্ষেত্রেই চাষ করা যায়। তবে সর্বোচ্চ ফলন পেতে থোড় আসা থেকে ধান পাকার আগে পর্যন্ত জমিতে পর্যাপ্ত পানি নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া ধান ৮০ শতাংশ পাকলেই তা কেটে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হয় যাতে চালের গুণমান নষ্ট না হয়।

উপসংহার

পুষ্টির অভাব দূরীকরণ এবং উচ্চ ফলন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ব্রি ধান ১০০ একটি গেম-চেঞ্জার জাত। এটি যেমন কৃষকের আয় বৃদ্ধি করে, তেমনি দেশের জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। বোরো মৌসুমে যারা ব্রি ধান ২৮ চাষ করে অভ্যস্ত, তাদের জন্য ব্রি ধান ১০০ হতে পারে সবচেয়ে সেরা ও লাভজনক বিকল্প।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow